আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সমীকরণ

0
17

২০১৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের হিসাব-নিকাশ করে বুদ্ধিমত্তার সাথে এগুচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দেশে-বিদেশে দুর্নাম আছে যে গত নির্বাচন বড় রাজনৈতিক দলবিহীন এবং প্রায় ভোটারশূন্য হয়েছিল, তাই এবার সবার অংশগ্রহণে পুরো গণতান্ত্রিকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই আবারও ক্ষমতায় আসতে চায় দলটি, এমনটিই মনে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই দলটির প্রধান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনা করেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। বর্তমান মন্ত্রিসভার রদ-বদলের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির কিছু সিদ্ধান্ত ও কার্যকলাপ দলটির আদর্শিক অবস্থান বিশেষ করে ইসলামের সাথে দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, মহাজোটের ভবিষ্যৎ, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দলটির অবস্থান, তদুপরি আগামি নির্বাচন, ইত্যাদি বিষয় বারবার আলচনায় আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি সেকুলার, অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসাবে পরিচিত যারা সব ধর্মকেই শ্রদ্ধা করে কিন্তু ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি সমর্থন করে না।

ধর্মের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অবস্থান নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি করে সুবিধাবাদীরা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। আওয়ামী লীগ মনে করে ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে যে যার ধর্ম স্বাধীন পালন করার ক্ষমতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে দলটি কোনো ধর্মেরই বিরুদ্ধে নয়, বরং যারা ধর্মকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে তাদের বিরোধিতা করেছে। এ কারণেই জামায়াতে ইসলামীর মতো তথাকথিত ইসলামপন্থি দল এবং বামদের মতো তথাকথিত ইসলামবিরোধী দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আদর্শিক বিরোধ।

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী এই দলটি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ যে তথাকথিত ইসলামী রাজনৈতিক দল তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানস সরকারকে সমর্থন করে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল তাদের বেশ কয়েকজন নেতাকে যুদ্ধাপরাধে বিচারের মুখোমুখি করতে সমর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগ বিরোধীরা বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে আওয়ামী লীগ একটি ইসলামবিরোধী দল কিন্তু দলটি এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। তাদের দাবি আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক, মৌলবাদ বিরোধী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন। বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিকদলগুলোর মধ্যে তথাকথিত ইসলামী দল থাকলেও মূলত বামপন্থি দলগুলোর প্রভাবই বেশি।

এই দলগুলো থেকে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিও আছেন বর্তমান মন্ত্রিসভায়, এমনকি এমন বাম নেতারাও মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন যারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধিতা করেছেন, এমনকি যখন তিনি খুন হন তখন প্রকাশ্যে আনন্দ-উল্লাস পর্যন্ত করেছেন। ভোল পাল্টে তাদের কেউ কেউ এখন খোদ আওয়ামী লীগেরই নেতা।
ইসলাম ধর্মকে রাজনীতিতে নোংরাভাবে ব্যবহার করা শুরু করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান এবং তাদের পূর্ব পাকিস্তানি দোসররা। মুখে ইসলামের কথা বললেও আমাদের সাথে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী আচরণ করেনি শাসকরা। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশকে সবসময় বঞ্চিত করা হয়েছে।

দখলদার পশ্চিম পাকিস্তানের বর্বর কার্যকলাপের বিরোধিতা করাকে তারা এবং তাদের সহযোগী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও অন্যেরা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে ইসলামের বিরোধিতা হিসাবে। যেহেতু স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও আরও কয়েকটি তথাকথিত ইসলামী দল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে খুন, নির্যাতন, ধর্ষণের মত জঘন্য কাজের সাথে জড়িত ছিল, তাই স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামকে এক ধরনের দেশ ও মানবতাবিরোধী ধর্ম হিসেবে স্টেরিওটাইপ করা হয়। এতে যোগ দেয় সেক্যুলার বামদলগুলো। গণমাধ্যম বিশেষ করে বাংলা চলচিত্রে ইসলাম ও ধার্মিককে খারাপ চরিত্রে দেখিয়ে বিশেষ করে শিশু-কিশোর, তরুণ ও যুবকদের কাছে ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়।

অন্যদিতে সাধারণ ক্ষমা পেয়ে জামায়াতে ইসলামীও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জিহাদের নামে অসংখ্য ছাত্রকে খুন ও আহত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে কয়েকটি তথাকথিত ইসলামী দলের ন্যাক্কারজনক ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগ ও বামদল করতিক ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের দোষারোপ আর অন্যদিকে ইসলামের কথা বলে জামায়াতে ইসলামীর উগ্রনীতির কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি বৃহৎ মুসলমান জনগোষ্ঠী যারা মুলত শিক্ষিত ও সচেতন কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত নন, যারা নীরবে কোরআন-হাদিসের ভিত্তিতে ইসলাম পালন করেন কিন্তু মাজার পূজা করেন না, যারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের সাথে অন্যায় করেছে কিন্তু এও বিশ্বাস করেন যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে ভারতের অধীনস্ত হওয়া নয় ববং যারা সত্যিকার অর্থেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে যে যার ধর্ম নির্বিঘ্নে পালন করতে পারবে—তারা আশাহত হন। স্বাধীনতার পরে ৪৬ বছর আওয়ামী লীগ এই মধ্যপন্থী মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা বুঝতে চাইলেও দলের ভেতরে ও বাইরের ইসলাম বিদ্বেষী তথাকথিত সেক্যুলাররা সে সুযোগ দেয়নি।
অনেক দেরীতে হলেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নীরব, মধ্যপন্থি, মুলত মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বুঝতে পেরেছেন আর তাতেই গাত্রদাহ শুরু হয়েছে নিজেদেরকে সেক্যুলার ও অসাম্প্রদায়িক দাবি করা কিন্তু সত্যিকার অর্থে ইসলাম বিদ্বেষী চক্রের। কওমি মাদ্রাসার ডিগ্রিকে দেশের মূলধারার বিশেষ করে আলিয়া মাদ্রাসার ডিগ্রির সমমান ঘোষণা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এটা থিক যে, কওমি মাদরাসার শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন প্রয়োজন যেমন তাদের শিক্ষাক্রমে ইংরেজি ভাষা, বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তি, ইত্যাদি বিষয়ের এবং উর্দু ভাষা শিক্ষা বাতিল করা প্রয়োজন, কিন্তু আলিয়া মাদারসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সমান পড়ালেখা করেও তারা কেন সমমানের ডিগ্রি পাবে না তা কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষীরা প্রমাণ করতে পারেনি। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য অপসারনের দাবি জানায় হেফাজতে ইসলাম। সুপ্রিম কোর্ট তথা বাংলাদেশের আইনের সাথে গ্রিক দেবীর অসামঞ্জস্যতা বিবেচনা করে সরকার ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে সরিয়ে অ্যানেক্স বিল্ডিং এর সামনে স্থাপন করে। এই ঘটনাকে নিজেদেরকে সেক্যুলার ও অসাম্প্রদায়িক দাবি করা বামরা হেফাজতের প্রতি বর্তমান সরকার তথা আওয়ামী লীগের আত্মসমর্পণ দাবি করছে এবং প্রচার করছে যে দলটি মৌলবাদীদের সাথে সখ্যতা তৈরি করছে যা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং স্বাধীনতার চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তৃনমূল পর্যায়ের একটি গণমুখি রাজনৈতিক সংগঠন। যে সংগঠন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, যাদের আহ্বানে তাদের ‘জয়বাংলা’ স্লোগান নিয়ে দেশের গনমানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তারা কী এত সহজে স্বাধীনতার চেতনা পরিপন্থি কাজ করতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে এবং এই ভূখণ্ডের মানুষ দল-মত- ধর্ম- বর্ণ- নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি নির্বিশেষে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে বসবাস করবে। আমাদের দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ, ধর্মহীন নয়; আমরা অসাম্প্রদায়িক, কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বিদ্বেষী নই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here