ত্যাগ, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস মাহে রমজান |

0
16

মাহে রমজানের রহমতের দশকের আজ শেষ দিন। রহমতের এই দশদিনে এসে আল্লাহর দরবারে আকুল কণ্ঠে ফরিয়াদ জানাতে হবে যেন আমরা রহমতের স্রোতধারায় সিক্ত হতে পারি। আল্লাহর রহমত ও করুণাধারায় যেন আমাদের দুঃখপীড়িত জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। বছরের অন্য দিনগুলোতেও মুসলমানদের জীবনধারা একেবারেই বল্গাহীন বা লাগামছাড়া থাকে এমন নয়। ইসলামনিষ্ঠ মানুষেরা কম বেশি ধর্মাচার ও আল্লাহর উপাসনায় রত থাকলেও তার বিপরীতে গরিষ্ঠ মানুষের কলুষপূর্ণ স্বার্থনিষ্ঠ কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্ব জনপদ থাকে রুক্ষ, রিক্ত এবং ঐশী করুণা এজন্যই থাকে স্তিমিত। ব্যতিক্রম শুধু মাহে রমজান। মাহে রমজান খোদায়ী অনুগ্রহ ও করুণাধারায় মানবতার পুণ্যসিক্ত ও সমৃদ্ধ হওয়ার মাস। আল্লাহর সঙ্গে বান্দার দূরত্ব ঘুচে যায় এ মাসে। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সেতুবন্ধের নূরছটায়-আলোকমালায় দুনিয়ায় অঝোর ধারায় নামে রহমতের বারিধারা। আল্লাহর ডাকে নিষ্ঠার সাথে সাড়া দেয়া মানুষের সৌভাগ্য ও শান্তি নিশ্চিত হয় রমজানে। মাহে রমজান বান্দাহর প্রতি স্রষ্টার এক বড় অনুগ্রহ। পাপ-তাপে দগ্ধ মানুষের করুণাসিক্ত হওয়ার বিরাট সুযোগ ঘটে এ মাসে।

মুসলমানদের পাপে ভরা মৃত জীবনবৃক্ষ যেন আবার সজীব হয়ে ওঠে এ রমজানে খোদায়ী রহমতের বারিধারায়। ত্রিশটি ফরজ রোজাসহ তারাবিহ, সাহরি, ইফতার, নফল নামাজ ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে পুণ্যের যে ধারা প্রবাহিত হয় তাতে বান্দাহর আমলনামা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রোজাদারের ধ্যানে-চিন্তায়, মননে-কর্মক্ষেত্রে অনুকূল পরিবর্তন আসে। উচ্ছ্বসিত মন বারবার পুণ্যের হাতছানি দিয়ে ডাকে। আর তাই তো প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ইখলাছের সঙ্গে পবিত্র রমজান মাসের রোজা রাখে এবং রাতে তারাবিহর নামাজও আদায় করে, তাহলে সে সকল পাপ থেকে এমনি পূত-পবিত্র হয়ে যায়, যেমনি সদ্যপ্রসূত শিশু নিষ্কলুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করে থাকে।’ (নাসাঈ)। প্রতিটি নিষ্ঠাবান রোজাদার এ মাসে রোজা, তারাবিহ ও নানা ইবাদত বন্দেগিতে রত থেকে আল্লাহর নির্দেশই পালন করে। পাপবোধ, স্বার্থচিন্তার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে, মানুষের প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠ হবার সতত প্রেরণা সৃষ্টি হয় রমজানে।

‘রমজান’ শব্দটির মধ্যেই লুকায়িত আছে এ মহান মাসের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য। সকল মহত্ত্বকেই যেন এ পরিপূর্ণ শব্দটি ধারণ করে রেখেছে অত্যন্ত চমৎকারভাবে। ‘রমজান’ শব্দটি ‘রমজ’ ধাতু থেকে উৎপন্ন। আর ‘রমজ’ শব্দের দুটো অর্থ আছে। এক. জ্বালিয়ে ফেলা, পুড়িয়ে ফেলা। যেহেতু এ মাসের সিয়াম সাধনা এবং সার্বিক ইবাদত রিয়াজত বান্দাহর চরিত্রের অবাঞ্ছিত দিককে জ্বালিয়ে একেবারে ছাই করে দেয়ণ্ড তাই এ মাসকে রমজান বলে। দুই. মরুদ্যানের আকস্মিক বৃষ্টিকেও ‘রমজ’ বলা হয়। এ বৃষ্টি মরুভূমির মানুষের দেহ মন আত্মা এবং সার্বিক পরিবেশকে যেমন সজীব করে তুলে ঠিক তেমনি রমজানও পাপ পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত মানব জীবনের মরুদ্যানে বয়ে আনে রহমতের প্রত্যাশিত বৃষ্টি। তাই একে ‘রমজান’ বলে। বাস্তবেই আমরা রমজানের দিনে আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ ও রহমতের বারিধারা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি উপলব্ধি করি। রমজান তাই মহিমান্বিত ও রহমতপূর্ণ। মানুষের সামগ্রিক জীবনে রোজার ইতিবাচক প্রভাব ক্রিয়াশীল। রোজার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক তাৎপর্য অপরিসীম। ব্যক্তি চরিত্রের অনুকূল পরিবর্তনে ও অপরাধমুক্ত জীবন গঠনে রোজার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা লক্ষণীয়। প্রকৃত রোজাদার অন্যের কল্যাণ প্রয়াসী হয়, ক্ষুধার অন্তর্জ্বালা অনুধাবন করে গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ায়। একজন প্রকৃত রোজাদার কখনো অপরের ক্ষতি ও শান্তি নষ্ট করতে পারে না। যদি তার দ্বারা এমন কিছু ঘটে তবে সে রোজা অন্তঃসারশূন্য উপবাস ছাড়া কিছুই নয়। ওই পথ থেকে আল্লাহ পাক আমাদের রক্ষা করুন। পাপ তাড়না ও পাপাচার থেকে আত্মরক্ষায় সকলকে মহান প্রভুর কাছে মিনতি জানাতে হবে রোজার করুণা সিক্ত দিনগুলোতে। তবেই ক্ষমা ও পরিত্রাণ আশা করা যায়।

আল্লাহর নির্দেশ মেনে এই একটি মাস ইবাদত বন্দেগি, সৎ উপায়ে জীবন ধারণ, ভালো কাজে অগ্রসর হওয়া ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা, পরনিন্দা, পাপাচার ও জুলুমের পথ থেকে ফিরে আসার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং সর্বক্ষণ পরহেজগারির পথে সুদৃঢ় থাকতে পারলে আল্লাহর রহমতের বারিধারায় আমরা সিক্ত হতে পারি। নিষ্কলুষ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন জীবন গঠনের সতত প্রয়াস ও অনুশীলন করে যেতে হবে মাহে রমজানের মহিমান্বিত দিনগুলোতে।

পবিত্র কুরআনের নানা স্থানে মহান আল্লাহ পাক তাঁর সেরা সৃষ্টি মানবজাতিকে সৎকর্মের নির্দেশ দিয়েছেন। অসৎ, ক্লেদাক্ত পথ থেকে দূরে থাকার আহবান জানিয়েছেন নানা প্রসঙ্গে বহুবার। জোর দিয়ে এও নির্দেশ রয়েছে মানুষের প্রতিণ্ড সৎ কাজ ও ইবাদত বন্দেগির প্রতিদান হচ্ছে করুণা প্রাপ্তি ও নিশ্চিতভাবে আল্লাহর রহমত। পৃথিবীতে মানুষের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় নিজেদের কাজ ও আমলের ভাল-মন্দ বিবেচনায়। মানুষেরা সৎকর্মশীল, সত্যনিষ্ঠ, কর্তব্যপরায়ণ ও সদাচারে অভ্যস্ত হলে পৃথিবীময় ঐশী অনুগ্রহ ও কল্যাণধারা বর্ষিত হয় অবারিত। আর অসৎ কর্মের প্রতিফল হচ্ছে দুঃখ, গ্লানি, বিপদ-দুর্দশা ও খোদায়ী গজব। আল্লাহ পাক বলেন, ‘জলে স্থলে যত বিপর্যয় তোমরা দেখ, তা তো তোমাদের দু’হাতের উপার্জন’ [কুরআন মজিদ]। এতে বুঝা যায় জগতে যত অশান্তি, হানাহানি, বিপর্যয় ও মানুষের দুঃখ-কষ্ট লেগে আছে সবই মানুষেরা নিজ নিজ কাজের প্রতিদান হিসেবে পেয়ে থাকে। আর সদাচার, সহানুভূতি, মানবতাবোধের চর্চায় শান্তি বয়ে চলে জগৎজুড়ে। বান্দাহ আল্লাহর প্রতি সমর্পিত হলে দুনিয়া হয়ে ওঠে পুষ্প উদ্যান, শান্তির ঠিকানা। মাহে রমজানে যেহেতু মানবিক গুণাবলির উৎকর্ষ ঘটে, রোজাদাররা সত্যনিষ্ঠ, পরার্থমুখী জীবনাচারের দিকে মনোযোগী হয়ণ্ড তাই রোজার মাস জুড়ে বর্ষিত হয় ঐশী করুণাধারা ও প্রসন্ন রহমত। মহান প্রভুর দয়া, করুণা ও ক্ষমায় নিজের জীবনকে ধন্য ও পুণ্যময় করতে মাহে রমজানে সৎ কাজে অগ্রসর হতে হবে। মন্দ ও ক্ষতিকর জীবনধারার প্রতি ঘৃণাবোধ জাগ্রত করতে হবে। প্রিয় নবী (দ) বলেন, “ইন্নাল্লাহা লা ইয়ান্‌জুরু ইলা সুয়ারিকুম, বাল্‌ ইয়ান্‌জুরু ইলা কুলুবিকুম ওয়া নিয়্যাতিকুম”ণ্ড অর্থাৎ আল্লাহ পাক তোমাদের বাহ্যিক চাকচিক্য ও চেহারার দিকে তাকান না, আল্লাহ পাক দেখেন তোমাদের ভেতরের অবস্থা ও তোমাদের নিয়ত বা উদ্দেশ্য। নবীজীর (দ) বাণীর আলোকে বলা যায়, দেখতে কাউকে পরিপাটি, সাজানো-গোছানো জীবনে অভ্যস্ত মনে হলেও সত্যি সত্যি যদি মানুষ আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, কথায়, কাজে আচরণে সৎকর্মশীল না হয় তাহলে তার নিস্তার বা পরিত্রাণ সুদূরপরাহত। চাকচিক্য ও প্রদর্শনী বাদ দিয়ে ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা গেলে আসল মানুষ হওয়া যায়। মর্মগত পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তার দিক থেকে সৎ, সত্যনিষ্ঠ ও পুণ্যকর্মে নিবিষ্ট হওয়াই আল্লাহর কাছে মর্যাদাশীল হবার একমাত্র উপায়। মাহে রমজানে সংযমের যে শিক্ষা ও চেতনার কথা বলা হয় তা অর্জিত হয় স্বচ্ছ নিয়ত, বিশুদ্ধ কর্ম ও ইবাদাত-সাধনার মাধ্যমে। সৎকর্মশীলতা, উদারতা, ত্যাগ, পরকল্যাণে আত্মনিয়োগ ও গরিব-দুঃখীর সেবার মানসিকতা জাগ্রত করার মোক্ষম সুযোগ মাহে রমজান। তবেই জীবন ও জগৎ হয়ে উঠবে শান্তি ও স্বস্তির অনিশেষ ঝর্ণাধারা। মাহে রমজানের রহমতের দশকের শেষপ্রান্তে এসে আসুন আমরা আল্লাহ পাকের দরবারে করুণাসিক্ত প্রার্থনা জানাই‘হে আল্লাহ! আমাদের দুঃখপীড়িত জীবন বদলে দাও। তোমার রহমত ও অনুগ্রহ অঝোরধারায় আমাদের ওপর বর্ষণ করো।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here