১০ হাজার শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত

0
84


কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ বসবাস করে। প্রায় আট বর্গকিলোমিটারের এই এলাকায় একটিও সরকারি প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। এরফলে প্রায় ১০ হাজার শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।জানা গেছে, পর্যটননগরী কক্সবাজার শহরের ১নং ওয়ার্ডে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়ায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ শিশু। স্থানীয়দের তথ্যমতে, বর্তমানে সেখানে শিশুর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। কিন্তু বিপুল সংখ্যক এই শিশুদের জন্য সরকারি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। একারণে শতকরা ৯০ ভাগ শিশু শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
যেখানে দুর্গম গ্রামেও প্রায় শতভাগ শিশু এখন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়, সেখানে পর্যটন শহরের ভেতরের একটি এলাকার ৯০ শতাংশ শিশু বিদ্যালয় স্বপ্নেও দেখার সুযোগ পায় না। একারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অক্ষরজ্ঞানহীন থেকে যাচ্ছে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১নং ওয়ার্ডে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা রয়েছে সাতটি আর প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬টি। এগুলোও চলছে মানের বাছ বিচার ছাড়াই। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাত্র ২ হাজার শিশু পড়াশোনার সুযোগ পায়। ক্রমানুসারে বাকি ৮ হাজারেরও বেশি শিশুদের কপালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ জুটে না। এছাড়াও এই এলাকার মানুষ গুলো এতবেশি দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে, যাদের টাকা খরচ করে সন্তানদের এলাকার বাইরে পাঠিয়ে পড়ালেখা করানো সম্ভব হয় না।
জানা গেছে, এই এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা গুলোতে শিক্ষার্থীরা মাত্র ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পায়। ৫ম শ্রেণির গ-ি শেষ হলে উচ্চশিক্ষা আর কপালে জুটেনা। এরপর বাপ দাদার পেশা হিসেবে রোজগারের জন্য শিশুদেরও ছুটতে হয় গভীর সাগরে মাছ ধরা বা শুটকি মহালে কাজের খোঁজে।
পশ্চিম কুতুবদিয়াপাড়া এলাকার জেলে আবুল কালামের (৩৯) তিন সন্তান রয়েছে। এরমধ্যে একটি ছেলে, বাকি দু’জন মেয়ে। তাঁর বড় মেয়ে তাসমিয়ার বয়স ১০ বছর। তাঁর তিন সন্তানই বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু টাকার অভাবে তিনি কাউকেই বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেননি। গত দুই বছর ধরে বড় মেয়ে তাসমিয়া মা মনোয়ারা বেগমের সাথে শুটকি মহালে কাজ করে আয় রোজগার করছে।
জেলে আবুল কালাম জানান, অন্যান্য অভিভাবকের মত তিনিও স্বপ্ন দেখেন সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর। কিন্তু স্বাদ থাকলেও, তাঁর সাধ্য নেই।
কারণ হিসেবে আবুল কালাম বলেন, বিশাল এই এলাকার কোথাও সরকারি কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। কয়েকটি কেজি স্কুল রয়েছে। সেগুলোতে পড়াতে গেলে প্রচুর টাকা দরকার। যা তাঁর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তিনি ধারণা করেন, তারা দেশের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয়। তা না হলে সড়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কোন কিছুই সরকারিভাবে তাদের জন্য ব্যবস্থা নেই কেন?
নাজিরারটেক এলাকার জেলে সৈয়দ আলম জানান, তাঁর ছয় সন্তান। এরমধ্যে এক ছেলে স্থানীয় একটি কেজি স্কুলে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। টাকা এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাঁকে আর পড়াতে পারেনি তিনি। আব্দুর রহমানের বয়স এখন ১৫ বছর। বর্তমানে সে শুটকি মহালে শ্রমিকের কাজ করে পরিবারে জোগান দিচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা মোহাম্মদ ফারুক জানান, এত বিশাল এলাকায় সরকারি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে ৯০ শতাংশ শিশু শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। শিক্ষা না থাকার সুযোগে দিনদিন কুসংস্থারও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখানকার নিরক্ষর মানুষ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে গুনাহ (মহাপাপ) হিসেবে দেখেন। একারণে প্রতিটি পরিবারে ৬ থেকে ৮ জন পর্যন্ত সন্তান থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে ১০ টি সন্তানও দেখা যায়। এই অশিক্ষার অভিশাপ থেকে তারা মুক্তি পেতে চান।
সমাজকর্মী আতিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি প্রচারণা চালায় প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক বলে। যদি বাধ্যতামূলকই হয় তাহলে, এত বিশাল এলাকায় একটিও সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই কেন? অজানা কারণে তাদেরকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে তিনি দাবী করেন।
কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কমিশনার আক্তার কামাল জানান, তাঁর এলাকায় সরকারি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। মাঝে মধ্যে এনজিও সংস্থা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। সেগুলো বছর দুয়েক চলার পর হাওয়া হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, শিক্ষায় বর্তমানে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ শিক্ষার অভাবে তাঁর এলাকায় একের পর এক নিরক্ষর প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here