২০২৩ সালেই চালু হবে মাতারবাড়ি ডিপ সী-পোর্ট

0
25


২০২৩ সালের মধ্যেই চালু হবে মাতারবাড়ি ডিপ সী–পোর্ট। সেই লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে। জাপানের কাশিমা ও নিগাতা (পূর্ব) বন্দরের আদলে নির্মিত হবে এটি। তবে বন্দরটি সমুদ্রের কিনারায় না করে চ্যানেল (জাহাজ চলাচলের পথ) তৈরির মাধ্যমে সমুদ্রের সঙ্গে এটিকে সংযুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে চ্যানেলে যাতে পলি জমতে না পারে সেজন্য পানির প্রবাহ রোধ করা হবে। এই বন্দরে ভিড়তে পারবে আট হাজার টিইউএস কন্টেনারবাহী জাহাজ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে শিপিং বাণিজ্যে পাল্লা দিতে এই পোর্ট আমাদের বহুদূর এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি এটি দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন ওয়ার্কশপ অন জাইকা প্রিপারেটরি সার্ভে অন মাতারবাড়ি পোর্ট ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে।

কর্মশালায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমডোর জুলফিকার আজিজ বলেন, ‘আমাদের হাতে যেসব প্রকল্প আছে, যেমন– পিসিটি, লালদিয়া ও বে–টার্মিনাল এগুলো শেষ হওয়ার পরও আমাদের সক্ষমতা হবে সাত মিলিয়ন টিইইউ’স। তাহলে পূর্বাভাস অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিকল্প কী? তাই আমরা মাতারবাড়ি এবং পায়রা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের আশা ২০২৩ সালের মধ্যে মাতারবাড়িতে নতুন বন্দরের অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারব।’

বন্দর চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘নতুন এই সমুদ্র বন্দরের সাথে সড়ক ও রেলপথ সংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে।’

কর্মশালায় মাতারবাড়ি ডিপ সী–পোর্ট নিয়ে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেন বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্ল্যানিং এন্ড এডমিন) মোহাম্মদ জাফর আলম। এতে জাইকার প্রতিনিধি মি. ওয়াতারো ওয়াসায়া বক্তব্য রাখেন। এছাড়া কর্মশালায় বন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এতে বলা হয়, ‘দ্য ইনিসিয়েটিভ অব দ্য বে অফ বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্র্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ শীর্ষক উদ্যোগের সূত্রপাত হয় ২০১৪ সালে। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরকালে বিষয়টি নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করেন। সেখানে মহেশখালী এলাকায় বিদ্যুৎ শক্তির উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাপান সরকারকে বাংলাদেশের দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার এলাকায় সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরির আহ্বান জানানো হয়। এরই প্রেক্ষিতে জাইকা মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে। ইতোমধ্যে মহেশখালীতে ১২০০ মেগাওয়াট একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এই কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি এবং খালাস করার জন্য যেই চ্যানেল এবং টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে সেই অবকাঠামো ব্যবহার করে মাতারবাড়িতে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এরই প্রেক্ষিতে ১৬ মিটার ড্রাফট এবং ২৫০ মিটার চওড়া একটি চ্যানেল নির্মাণের লক্ষ্যে প্রাক সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। জাপান সরকারের অর্থায়নে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ডিপ সী–পোর্ট নির্মাণ করা হবে। এই বন্দর পরিচালনা করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনায় মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দরকে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কর্মশালায় বলা হয়, কলম্বো পোর্টে সর্বোচ্চ ১৯২০০ টিইইউএস কন্টেনার নিয়ে জাহাজ ভিড়ে। ভারতের জহরলাল নেহেরু পোর্টে জাহাজ ভিড়ে সর্বোচ্চ ১৩১০০ টিইইউএস কন্টেনার নিয়ে, চেন্নাই বন্দরে কন্টেনার জাহাজ ভিড়ে ৬৮০০ টিইইউএস কন্টেনার নিয়ে। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরে আড়াই হাজার টিইইউএস–এর বেশি কন্টেনার নিয়ে কোনো জাহাজ ভিড়তে পারে না। এই অবস্থায় অধিক ড্রাফটের জাহাজ যাতে ভিড়তে পারে সেজন্য মাতারবাড়িতে ডিপ সী–পোর্ট নির্মাণ জরুরি।

কর্মশালায় আরো বলা হয়, ২০৪২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ হবে। ওই সময় দেশের কন্টেনার হ্যান্ডলিং এর পরিমাণ ৫৭ লাখ টিইইউএস থেকে ৬৫ লাখ টিইইউএস–এ পৌঁছবে এবং বাংলাদেশকে ৮ হাজার ২০০টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করতে হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলাতে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।

কর্মশালায় বলা হয়, প্রাথমিকভাবে দু’টি জেটি ও পশ্চাদসুবিধা সম্বলিত সাড়ে সাতশ’ মিটারের ইয়ার্ড নির্মাণ করে মাতারবাড়ি ডিপ সী–পোর্টের কার্যক্রম শুরু করা হবে। একটি কন্টেনার জেটি এবং একটি মাল্টিপারপাস জেটি নির্মাণ করে বড় মাদার ভ্যাসেল বার্থিং দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই টার্মিনালে ৩২০ থেকে ৩৫০ মিটার লম্বা এবং ১৬ মিটার ড্রাফটের অন্তত ৮ হাজার কন্টেনারবাহী জাহাজ ভিড়ানো যাবে। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে সর্বোচ্চ ১৯০ মিটার দৈর্ঘ এবং ৯.৫ মিটারের বেশি ড্রাফটের কোনো জাহাজ ভিড়ানো যায় না। মাতারবাড়ি বন্দরে চট্টগ্রাম বন্দরের দ্বিগুণেরও বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজ হ্যান্ডলিং করা যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। মাতারবাড়ি থেকে ফিডার ভ্যাসেলে কন্টেনার দেশের অন্যান্য বন্দরে পরিবহন করা হবে। মাতারবাড়ি ডিপ সী–পোর্ট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নয়া সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে বলেও কর্মশালায় বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here